হঠাৎ চলে গেলেন না ফেরার দেশে অধ্যক্ষ গোলাম আযম

0
হঠাৎ চলে গেলেন না ফেরার দেশে অধ্যক্ষ গোলাম আযম
অধ্যক্ষ গোলাম আযম হঠাৎ চলে গেলেন না ফেরার দেশে

হঠাৎ চলে গেলেন না ফেরার দেশে অধ্যক্ষ গোলাম আযম


আনোয়ার হোসাইনঃসিলেট নগরীর আব্দুল গফুর উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম আযম হঠাৎ চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ইসলামী আন্দোলনের একনিষ্ঠ দায়িত্বশীল প্রিয় গোলাম আযম এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা আমরা কেউই কিন্তু কখনো ধারণা করিনি। স্ত্রী, সন্তান, ভাই বোন, আত্নীয় স্বজন, সাংগঠনিক জীবনের আপনজন সবাই কে কাঁদিয়ে নিরবে চলে গেলেন মহান প্রভূর দরবারে। ৮জুন ২০২০ বিকাল ৩টায় তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সিলেট মহানগরী ও সিলেট সদর উপজেলা সহ মরহুমের পরিচিত মহল, আত্নীয় স্বজন,বন্ধু-বান্ধব ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক পরিসরে নেমে আসে শোকের ছাঁয়া। প্রিয়জন হারানোর বেদনা। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তিনি হাইপারটেনশন ও ডায়বেটিস রোগে ভূগছিলেন। হঠাৎ রক্তের সুগার নিল হয়ে হ্রদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুকালে স্ত্রী,
দুই মেয়ে ও এক ছেলে সহ অসংখ্য আত্নীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মরহুম অধ্যক্ষ গোলাম আযম ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন।

সোমবার রাত ৯টায় কুমারগাও জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঈমামতি করেন অধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। জানাজা পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিলেট জেলা উত্তর শাখার আমীর হাফেজ মাওলানা আনওয়ার হোসাইন খাঁন, মাওলানা আব্দুস সালাম মাদানী প্রমুখ। বিশ্বজোড়ে প্রাণঘাতী ভয়ানক করোনা পরিস্থিতিতেও জানাজায় সহস্রাধিক মুসল্লী অংশ নেন।

২য় জানাজার নামাজ পরদিন মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মরহুমের নিজ বাড়ি পশ্চিম সদরের লামাগাঁও জামে মসজিদ সংলঘ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও সহস্রাধিক মুসল্লী শরীক হোন। এতে প্রমাণ হয়, অধ্যক্ষ গোলাম আযম কেমন মানুষ ছিলেন। নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের একমাত্র ছেলে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ দানিয়াল।জানাজা পূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া পাঠানটুলার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম, মোগলগাও ইউপি চেয়ারম্যান মরহুমের মামাতো ভাই মোঃ হিরন মিয়া, হাজী আছন মিয়া, আব্দুর রকিব মানিক, আমির আহমদ, নাজির উদ্দিন, মরহুমের বড়ভাই প্রকৌশলী মোঃ গোলাম কিবরিয়া প্রমুখ।

কুমারগাঁওয়ে গোলাম আজম ভাইয়ের দাফন শেষে যখন বের হয়ে এসে গাড়ীতে উঠব, এ সময় চোখের কোণে মনের অজান্তেই দুফোটা নোনা জল জমা হল। বুক টা মুচড়ে উঠল। হায়! গোলাম আজম ভাইয়ের সাথে তাহলে আর দেখা হবে না ! মরহুম গোলাম আযম আল্লাহভীরু,নিরহংকার ও একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত নম্র,ভদ্র ও অমায়িক ব্যবহার সহ বহুবিধ মানবিক গুণের অধিকারী এক ব্যক্তি ছিলেন।গত ২৪ মে তাঁর সাথে বেশ কিছু সময় একান্ত আলাপ হয় তাঁর কুমারগাও বাসায়। অধ্যক্ষ গোলাম আযমের সাথে এটাই আমার সর্বশেষ সরাসরি সাক্ষাৎ। এরপর মোবাইলে সর্বশেষ আলাপ হয় ৩১ মে।

মরহুম গোলাম আযম ছাত্রজীবনে একজন মেধাবী ছাত্রনেতা ছিলেন।তিনি সিলেট সরকারী তিব্বিয়া কলেজের ছাত্রসংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ অনেক ছাত্র ও গণ আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আপাদমস্তক একজন শিক্ষক ছিলেন।শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে অনেক অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি সঠিক ও ন্যায়পথে থাকতে গিয়ে স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছে তাঁকে। অনেকবার কারাভোগ করেন।মরহুম গোলাম আযম ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, নম্র, ভদ্র, ইসলামী চেতনায় সমুজ্জ্বল, জন দরদী এবং সকলের প্রিয় একজন মানুষ। তিনি ছিলেন একজন সজ্জন, নামাজী, দ্বীনদার এবং ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ রাজপথের অগ্র সৈনিক। একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান আবার একেবারে সহজ সরল, নিরংহকারী, অমায়িক আচরণের অধিকারী এ রকম মানুষ এ সমাজে বড়ই বিরল। আমৃত্য একজন মজলুম হিসেবেই চলে গেলেন এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে।

পেশাগত কারনে প্রিয় গোলাম আযম ভাই কে এ পৃথিবীর কিছু মানুষ জন খুব একটা আরামে থাকতে দেয়নি।কিছু মানুষ- যারা তার খুব কাছের ছিলেন, এদের নিকট থেকে তিনি মারাত্মক অবিচার ও বেইনসাফীর শিকার হয়েছেন বলে আলাপচারিতায় কখনো কখনো তাঁর দুঃখের কথা বলেছেন। চাকুরি হারিয়ে তিনি নানারকম কষ্টে দিন পার করেছেন।

তবে মামলা ঘাটিয়ে মাত্র কিছুদিন আগে তিনি রায় পেয়ে আবার দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কিন্তু বড্ড অভিমান করে বুঝি চলেই গেলেন এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহর রহমতে উচ্চ আদালত তাঁর পক্ষে রায় দিলে পুনরায় প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসেন।প্রিন্সিপাল পদ থেকে আপসারণ সহ বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। তাকে চাকরি বাচাতে সুপ্রিম কোর্ট পযর্ন্ত লড়তে হয়েছিল।

অধ্যক্ষ গোলাম আযম এক লড়াকু মানুষ ছিলেন। আব্দুল গফুর স্কুল এন্ড কলেজে চ‍্যালেঞ্জে জয়ী হয়ে স্বপদে বহাল হন। তবে এ লড়াইয়ে তিনি মারাত্বক ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন । দীর্ঘ প্রায় কয়েক বছরের মত ছিলেন পদহীন। তবুও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তাঁর চাকুরীতে তিনি স্বপদে বহাল হোন।

ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিত প্রাণ হওয়ার কারণে অনেক ধৈর্য ধারণ করেছেন গোলাম আযম ।সেদিন ফোন করে হাইকোর্টের রায়ের কথা আমাকে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন। কাউকে তিনি তীর্যক কিংবা কটু কথা বলেন নি। তাঁর ছিল আল্লাহ তায়ালার প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
আসলে ভাল মানুষ গুলো এ দুনিয়াতে বেশী দিন থাকে না।মহান প্রভু অল্প সময়ে ভাল কাজ করিয়ে তাঁর প্রিয় মানুষ গুলো কে তাঁর দরবারে নিয়ে নেন।

ইসলামী আন্দোলনের একনিষ্ঠ দায়িত্বশীল প্রিয় গোলাম আযম এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা আমরা কেউই কিন্তু কখনো ধারণা করিনি।এ যেনো পৃথিবী ধংসের আগে পৃথিবীর ভালো মানুষগুলিকে একে একে তুলে নিচ্ছেন মালিক।
হে আল্লাহ! তুমি জান্নাতে প্রিয় ভাইটিকে একটি ঘর বানিয়ে দাও। (আমীন)