সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সূর্য ডুবতে বসেছে

0

সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সূর্য ডুবতে বসেছে বন্ধ হচ্ছে রাজশাহীর ছয়টিসহ দেশের দেড়শতাধিক ক্লিনিক

সিটিএনবিঃ ইতিমধ্যে বিপুল জনপ্রিয় ও সল্প মূল্যে স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সূর্যের হাসি ক্লিনিকের সূর্য ডুবতে বসেছে। আগামী ৩০ জুনের পর থেকে রাজশাহীর ছয়টিসহ দেশের দেড়শতাধিক ক্লিনিক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক। এতে করে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ। আর বেকার হবে হাজার হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

জানা গেছে, দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে সূর্যের হাসি ক্লিনিক ১৯৯৭ সাল থেকে ৬৪টি জেলায় ৩৯৯টি ক্লিনিক নিয়ে সরকারের সহযোগী সংস্থা হিসেবে প্রায় তিন কোটি মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে আসছিল।

কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে ২৫টি এনজিওগুলোকে বিলুপ্ত করে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার মধ্য দিয়ে ৩৯৯টি ক্লিনিকের মধ্যে ৩৬৯টি ক্লিনিক হস্তগত করার মাধ্যমে সূর্যের হাসি নেটওর্য়াক দায়িত্ব গ্রহণ করে।

শুরুতে নেটওর্য়াক সকল স্টাফকে চাকরি স্থায়ীকরণসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যবিমা ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে কোম্পানিতে রুপান্তরিত হয়।

পরবর্তীতে সবার অগোচরে কর্মসূচি টেকসই করার নামে ২৫টি ক্লিনিক স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং ৫১টি ক্লিনিককে নামে মাত্র স্যাটেলাইট ক্লিনিকে রুপান্তর করে অন্য ক্লিনিকের সাথে অঙ্গিভূত করে মোট ৭৬টি ক্লিনিককে বন্ধ করে দেয়।

বর্তমানেও আগামী ৩০ জুনের পর ১৩৪টি ক্লিনিক রেখে ৯০টি ক্লিনিক স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং ৬৯টি ক্লিনিককে নামে মাত্র স্যাটেলাইট ক্লিনিকে রুপান্তর করে অন্য ক্লিনিকের সাথে অঙ্গিভূত করে আরো ১৫৯টি ক্লিনিককে বন্ধ করার নোটিশ প্রদান করেছে।

এভাবে মোট ২৩৫টি ক্লিনিক বন্ধ করা হচ্ছে। ফলে সংবিধান সম্মত জনগনের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী জেলায় ৯টি ক্লিনিকের মধ্যে বাগমারা,পবা ও নওদাপাড়া ক্লিনিক রেখে বাদ বাকি ৬টি ক্লিনিককে বন্ধ করার নোটিশ প্রদান করেছে। এরমধ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪টি এবং মোহনপুর ও গোদাগাড়ীতে একটি করে রয়েছে।

ক্লিনিক ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সূর্যের হাসি ক্লিনিকে স্বল্পমূল্যে মাতৃত্ব ও গর্ভকালীন সেবা, শিশু স্বাস্থ্য, বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, স্বল্পমূল্যে প্যাথলজি পরীক্ষা, স্বল্পমূল্যে ভ্যাকসিনেশন সেবা দেয়া হয়ে থাকে।

গড়ে প্রতিদিন এসব ক্লিনিকে ৬০ জনের বেশি মানুষ সেবা নেন। প্রতিটি ক্লিনিকে কর্মরত আছে ১০ থেকে ১২ জন করে। ক্লিনিকগুলোর প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ এখানে সেবা নিতে আসেন, তাতে ক্লিনিকের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। কিন্তু তারপরেও ক্লিনিকগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত তাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি।

এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মুশফিকুল আজম সিটিএনবি কে জানান, আগামী ৩০ জুন থেকে ক্লিনিকগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি ঠিক আছে।

তবে কেন বন্ধ করা হচ্ছে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরবর্তীতে কি হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে মুশফিকুল আজম সিটিএনবি কে বলেন, এই বিষয়ে আমাদের কমিউনিকেশন অফিসার মি. মুনির আপনাকে বলবেন। তার ফোন কেটে দেয়ার কিছুক্ষণ পর আবার মুনিরুল ইসলামের সাথে ফোনে যোগাযোগ হয়।

কিন্তু মুনিরুল ইসলাম বলেন, আমার মেইলে আপনার প্রশ্নগুলো লিখে পাঠান। সিটিএনবি এর প্রতিবেদক কিছুক্ষন পর তিনটি প্রশ্ন লিখে মেইল করেন। কিন্তু পরে লিখিত প্রশ্নের উত্তর দেননি।

প্রশ্ন গুলো ছিল-

০১. বন্ধ হওয়া কর্মচারীদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি ? তাদের কোথাও আত্মিকরণের সুযোগ আছে কি? না থাকলে তারা সার্ভিস বেনিফিট কীভাবে পাবে?

০২. বন্ধ ক্লিনিকগুলো কোন কাজে ব্যবহার হবে?

০৩. ক্লিনিকগুলো কি আর্থিক না অন্য কোনো কারণে বন্ধ করা হচ্ছে?

এদিকে এর আগে মুশফিকুল আজমকে বলেছিলেন, সেবা প্রদানে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা অসঙ্গতিপূর্ণ এবং টেকসই নয়। বহু বছর আগে স্থাপিত এই ক্লিনিকগুলো এখন প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে। এ কারণে কর্তৃপক্ষ ক্লিনিকগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেসব ক্লিনিক বন্ধ করা হচ্ছে, সেগুলোকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফ.এ.এম. আঞ্জুমান আরা বেগম সিটিএনবি এর প্রতিবেদকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আগে দুইটি বন্ধ করা হয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আরও দুইটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগের দুইটির ব্যাপারে মেয়র ময়দোয়কে জানানো হয়েছে। সামনে যে দুইটি বন্ধ হবে। সে ব্যাপারেও অবগত করা হবে।

তিনি আরও বলেন,সূর্যের হাসি ক্লিনিকগুলো বন্ধ হওয়ায় সাধারণ রোগীদের একটু কষ্ট হবে। তবে তারা এখন মেডিকেলে ও আরবান হেলথ সেন্টারে যাবে। আর বন্ধ হওয়ায় ক্লিনিকগুলোতে ইপিআই সেন্টার সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে চালানো হবে।
বন্ধ হওয়া ক্লিনিকগুলোকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. এফ.এ.এম. আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। তবে আগামীতে একটা প্রস্তাব রাখবো। আর বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্লিনিকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক অন্য জায়গায় সংযুক্ত করে দিবে। এর আগেও তো করেছে।