কথিত গণজাগরণোত্তর যুগ ও বাঙালির ঘৃণা চর্চা

0
কথিত গণজাগরণোত্তর যুগ ও বাঙালির ঘৃণা চর্চা
কথিত গণজাগরণোত্তর যুগ ও বাঙালির ঘৃণা চর্চা- মামুন আবদুল্লাহ

বাঙালির ঘৃণা চর্চার অপসংস্কৃতি ও প্রেক্ষাপট

সিটিএনবিঃ গুজব-এ- আজম এর আগমন ঘটেছিল বছরখানেক আগে ।গুজব রটেছিল যে,দেশের কোন এক হাই প্রোফাইল ব্যক্তি মরণ ব্যাধি ক্যানসার এ আক্রান্ত হয়েছেন।মুলত গুজবটি ছড়িয়েছিলেন আমেরিকা প্রবাসী এক বাঙালি।ব্যস এতোটুকু ই!তাকে আর এগিয়ে নিতে হয়নি!সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই তো এর জন্য যথেষ্ট!শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই নয়,মানুষের মুখে মুখে এমনও শুনেছি সেই হাই প্রোফাইল ব্যক্তির মৃত্যু কামনা আর উল্লাস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারও কারও অভিব্যক্তি এমন ছিল যে, মনে হয় তারা এক নতুন মহাদেশ জয় করে এসেছেন।চিন্তা করুন একবার ; মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুতে কিভাবে এতো উৎফুল্ল হতে পারে?

এরপর কিছু দিন এ অপসংস্কৃতি বন্ধ ছিল। এই করোনা কালীন সময়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যু এবং অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের করোনায় আক্রান্ত হওয়া সেই অপসংস্কৃতিকে আবারও তাতিয়ে দিল।বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক শ্রেণীর মানুষের নগ্ন উল্লাস আর ঘৃণা যে কোন বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আর এখন সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রীর মৃত্যু তো পুরো সামাজিক মাধ্যমকে রীতিমত বুনো উল্লাসের একটা মস্ত বড় বিচরণভূমিতে পরিনত করেছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপে তার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ রীতিমতো আনন্দের সংবাদ হিসেবে বিবেচনা করে উল্লাস করছে। প্রকৃতপক্ষে এটাই কি আমাদের জাতীয় বোধ? আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কি আসলেই আমাদের এ কর্মকান্ড করার শিক্ষা দেয়??

কিন্তু কেন এমন হলো?বাঙালি মুসলিম মানস তো এমন ছিল না।পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ছিল না এমন নয় কিন্তু কারও মৃত্যুতে এমন উল্লাস সেটা কখনও কল্পনা করাও যেত না।বরং বিপদে আপদে একে অন্যের পাশে এসে দাড়িয়েছে। মৃত্যুর সংবাদে শোক জানিয়েছে দলমত নির্বিশেষে সবাই। তাহলে এই অপসংস্কৃতি আসলো কিভাবে? এই অপসংস্কৃতির উৎস জানতে হলে বর্তমান থেকে একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে।

এর চর্চা শুরু হয় মুলত গেল দশকের শুরুতে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে গঠিত গণজাগরণ আন্দোলনের নামে গঠিত একটা প্লাটফরমই মুলত এই হিংসা ছড়ানোর মুল কারিগর! দু:খজনক হলেও সত্য যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় সেই প্লাটফরম থেকে শুধু বেআইনি স্লোগান আর মানুষজনকে অপমানই করা হয়নি বরং পবিত্র ধর্ম ইসলামকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও করা হয়েছিল সেই শাহবাগ কেন্দ্রিক আন্দোলন থেকে।যার ফলশ্রুতিতে গঠন হয় ধমর্ভিত্তিক দল হেফাজতে ইসলাম।

কেউ যদি অপরাধী হয়েই থাকে তাহলে তাকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার করতে হবে। আমি বিচার প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি না। কিন্তু কোন ব্যক্তির বিচার কার্যকর করার পর সেই লাশের প্রতি অসম্মান আর অশ্রদ্ধা করার অধিকার কারোর নাই। শুধু তাই নয় একজন মানুষের মৃত্যুর থবর মিষ্টি মুখ করে ‍সেলিব্রেট করার সংস্কৃতিও এদেশে চালু করা হয়েছিল সেই সময় থেকে! একজন মানুষ যত বড় অপরাধী হোক না কেন বিচারের রায় কার্যকর করার পর তার কবরে হামলা এবং নামফলক ভেঙে ফেলা কী ধরণের সংস্কৃতি?অথচ এদেশে এগুলো দিনের আলোতেই ঘটেছে!

এই তো কয়দিন আগে একজন অভিযুক্তকে আদালতের আদেশে মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করা হলো। কিন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির এই দেশের মাটিতে কবর দেয়ারও কী অধিকার নাই? সেই মৃত ব্যক্তির লশের উপর জুতা নিক্ষেপ করা হলো! তার লাশ কবর থেকে তুলে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার জন্য মিছিল করা হলো।তা করেও ওরা ক্ষান্ত হয়নি। একদল নরপশু এসে তার কবরের উপর জুতা পেটা শুরু করলো। রীতিমতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলো এসকল কর্মকান্ড। প্রকৃতপক্ষে এসকল কর্মকান্ড উৎসাহ যুগিয়েছ পরবর্তীতে বিদ্বেষমূলক আরো কর্মকান্ডের।

সুতরাং এই মৃত ব্যক্তিকে অসম্মান আর উল্লাস প্রকাশের মত ঘৃণিত ও জঘন্য কাজ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এই শুরুটা হয়েছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও ঘৃণাচর্চা থেকে। দিনের পর দিন ধরে এ ধরনের অপসংস্কৃতি কেবলই বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ এ অপসংস্কৃতি এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে ; যা আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার, ভালোবাসা এবং নিয়মশৃঙ্খলাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মৃত্যু কামনা করা ও মৃত্যু সংবাদে আনন্দ করার এ অপসংস্কৃতি দূর হোক ; এ প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ মামুন আব্দুল্লাহ
চাকুরীজিবি।

শেয়ার করুন